হেমন্ত
"...পরাজেয় আত্মার সম্মুখে
বালক ঈশ্বর এক, চতুর্দিকে খেলেনা ছড়ানো --"
- শক্তি চট্টোপাধ্যায়
ধরে নাও, সমুদ্রতীরের কোনও শহরে আমার আর তোমার দেখা হয়ে গেল, বহুদিন পর, প্রথমবারের মতো।
দু'জনেই অন্তরে বেশ অবাক, কিছুটা ক্ষুণ্ণই হলাম একে অন্যকে ভালো থাকতে দেখে, কারণ, আমরা তো ভাবিনি ভালো থাকবে অন্যজন আমাদের ছাড়া। ভালো তো কারুরই থাকার কথা নয়, ভেবেছিলাম, কারণ প্রত্যেকে কারুর সঙ্গে যেমন আছে, কাউকে ছেড়েও তো আছে? তাই মুখে শুধু বলি, "ভালো তো? কতদিন পর...!"
*****
তোমার কাছে আতিশয্য চাইনি আমি, বুঝেছো নিশ্চয়ই? মনে করো নি তো, তোমার সর্বত্র ও সর্বক্ষণ আমি চেয়ে বসে আছি?
কারণে বা অন্যথায়, আমি কোথাওই লিখিনি
পূর্ণগ্রাস
জানো, আমার ভিক্ষা বলতে পেতে দেওয়া হাত।
সেখানেই তুলে দেবে কুড়িয়ে বাড়িয়ে আনা
সূর্যখন্ড, দিনের আলস্য, সমুদ্রের স্মৃতি।
বুঝেছো তো?
অবশ্য না বোঝার কারণও যথেষ্ট। অনুচ্চারণে তুমি আর আগের মতো খুশি হও না, বুঝে নিতে অসুবিধা হয় বাক্যের বিন্যাস -- শুরু ও শেষের আবরণ, মাঝের অগোছালো স্বভাব।
বেকবাগানে
তারে বসা পায়রারা উড়ে যায়
ফ্রী-স্কুল স্ট্রীটে
লং প্লেয়িং রেকর্ডের খদ্দের কমে আসে
পুরোনো বাড়ির রংচটা বারান্দারা
ভরদুপুরেও ঝিম মেরে থাকে
এদেরও এক নিজস্ব অনুচ্চারণ আছে,
বোঝো?
আমি কি তারও চেয়ে নীরব?
যদি একবার কান পাতো এখনও, যে-ভাবে আমরা আগে প্রায়ই থাকতাম সহজ জীবনে ---
দেখবে, এখনও শরীর-মধ্যে শুধু ঝর্ণারই উচ্চারণ পাবে।
শব্দেরা অসঙ্গতি। গৌণ।
তবে আমাদেরও দায়ভার আছে, বলো?
সবসময় জীবনের কক্ষগুলো আজীবন হয় না।
কখনও কখনও, সত্যিই তো,
কেউ বলে উঠতেই পারে,
"মধ্যবিত্তের আবার ঝর্ণা!"
অসময়ের আনাগোনা,
অকাজের ফিরিস্তি
আরও প্রাচীন কোনো অভ্যাসের ডাক
বা এমনিই, না-বোঝার ইচ্ছা
দূরত্বের প্রয়োজন, সবই
খুব ন্যায্য মনে হয় কখনও কখনও।
*****
আসলে আমরা কে না জানি, সময় চলে গেলে ছাড়ার বা ছেড়ে যাওয়ার মূল্য নেই আর! আমি আপ্রাণ বিনাশ ও নষ্ট চেয়েছি তোমার, কিন্তু সময় চলে গেলে, বুঝেছি, বিনাশেরও ধার কমে আসে। ছেড়ে যাওয়া, ছেড়ে থাকা সহজ হয় ক্রমে। কঠিন শুধু পাশে থাকা, সাহচর্য, একজীবন শূন্যতার কেন্দ্রে রাখা প্রেম।
সমুদ্রতীরের কোনও শহরে আমার আর তোমার দেখা হয়ে গেল, প্রথমবারের মতো। তোমার বাড়ি ছিল কোনও নদীর উৎসে, আমার মোহনায়। অথচ সমুদ্রের কাছে আমাদের অনেক ঋণ।
*****
বেশ।
তবে এই নাও,
উচ্চারণে আমি রাজা হলাম।
কথায় বললাম, আজ থেকে ঈশ্বর তোমার অঙ্গুরীর নাম
তোমায় ভালবাসে আর যারা,
প্রত্যেকের আজ দ্বাপর-অধীন অজ্ঞাতবাস
--- আচ্ছা, সত্যিই কী আমার এই উচ্চারণে
তোমার কিছু যায় আসে!
তার চেয়ে রাজা-টাজা নয়,
অনুচ্চারণই শ্রেয়।
গিরীশ পার্কে নোনাদীঘির পিঠে বসে
হাফ-লিটার ভাঙের গর্বে
কণাদ বলে ওঠে,
"এই শহরটা হারামি, ফালতু।
দেখিসনি, যখন শ্রাদ্ধবাড়ির লোকজন
পুকুরপাড়ে পিণ্ড রেখে যায়,
যখন তারে তারে ঘষা খেয়ে
ফিঙের শরীরে আগুন লেগে যায়,
যখন দুপুর তিনটেয় মালকোষ
সবচেয়ে কার্যকরী ---
তখন শালা এই শহরটা টেক অফ করতে জানে না!"
কণাদকে তুমি চেনো না, তবু
নিশ্চয়ই জানবে,
ও আমার চেয়ে অনেক স্পষ্ট কথা বলে।
কণাদ জানে না,
এই শহরে আর ফিঙে নেই।
আজ রাতের আকাশে কিছু নক্ষত্র জ্বলুক অকারণ
অকারণে আজ তোমার মনে আসুক
আমাদের দেখা হওয়ার দিন
যেখানে যা উজ্জ্বল, রঙিন ---
মুছে যাক নক্ষত্র সমাদরে।
আজ কিছু নক্ষত্র জ্বলুক।
*****
ডানদিকে তাকালে লাইটহাউস, মাইলখানেক দূরে জনপদ। তবু আমরা জানি, বলো -- জানি না, যে এই আমাদের শেষ দেখা নয়? সমুদ্রের পথে আমাদের আবার দেখা হবে। এরকমই, অনেক দিন পর। তুমি কোনও কাজে, আমি অকাজে। তখন না হয় আমরা কেবল ভালো চাইব একে অন্যের; ভাববো, একসঙ্গে যদি বা থাকতাম আমরা, কী এমন বেশি পাওয়া যেত!
*****
-- মনে রাখবে এত কিছু কথা?
-- না রাখার কোনো কারণ ঘটেছে কি?
-- ভোলারও তো কারণ ছিল না এতদিন,
যতটুকু জানি
-- কখনও ভেবেছো নিজে, ভুল জানো?
কখনও ভেবেছো, উচ্চারণ নয়
অভিমান ধরে ধরে
ধরে ধরে
পার হওয়া যায় বহুকাল?
পার তো হতেই পারো। ফেলে দিতে জানে কতজন?
*****
আমাদের বোঝা আর না-বোঝার মাঝে অনেক অন্তর। সে কথা আমরা বুঝি। তুমি মানুষকে বোঝো স্তব্ধতায়; আমি সখ্যে। আমি তোমাকে চাওয়া বুঝি, তোমাকে চাওয়ার পরিধি বুঝি না। তাই আমাদের কথা শুরু হয়েও দিক পায় না, বা হারিয়ে যায় সমুদ্রবাতাস আর সুরের আড়ালে। আমি বুঝি না, তোমার সাহচর্যের ভাষা হয়তো আলাদা; বুঝি না, আমার ইতিহাসে যা-কিছু উত্তরণ, তা হয়তো তোমার ইতিহাসে শোক! আমাদের বোঝায় অনেক না-বোঝার ভুল রয়ে যায়।
*****
-- হেমন্তের এই সাজ, খোলা আলো
নিচু স্বর, ঝুটো সমাপন
তোমাকে মানায়।
তুমিও কি পেরেছো জলাঞ্জলি দিতে
অকারণ
দুই চোখে জলের ওজন?
একদিন সেই প্রশ্ন,
"স্পর্শে খারাপ লাগে না তো?"
একদিন সেই বলা,
"যেন রেখে দিতে পারি চিরকাল"
(ভেবেছিলে, কাজলে ও থুতনির ঘামে
চিরকাল বুঝি এক শহরবিলাসী)
-- নয়, বলো?
এই যে রোজের এই অপেক্ষারা তোমার
এই যে শরৎ গেলে
আলোর নিথর বেঁচে থাকা?
*****
সাধারণ কোনও শহরে পথচলতি দিনে ভুল করেও আমরা একে অন্যের মুখ দেখি না; ভাবি, আমাদের পথ আলাদা। অথচ, সত্যি বলো তো, কখনও ভেবেছো, এত দূরের সমুদ্রের শহরে সেই পথই এক হয়ে যায় কিভাবে? বিজনে আমার দু’ দণ্ড শান্তি তুমি, স্বজনে অচিন।
সমুদ্রতীরে সন্ধে বাড়ে, ফাঁকা তট-জুড়ে সারাদিনের পায়ের ছাপ লেগে থাকে, আর কিছু মানুষ তখনও গর্জন ও হাওয়ার আড়ালে বাড়ি ফেরে, আর দূরের মন্দিরচূড়ায় আলো পড়ে। কোনও গমগমে রাস্তায়, ধরো, হঠাৎ দেখা হয়ে যায় আমার আর তোমার। দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, হইচইয়ের মাঝেই এই দেখা হওয়া বিষয়ে তুমি অস্ফুটে বলে ওঠো, “ভালো লাগলো”। আমি উত্তরে শুধু হাসি, ভালো লাগে না আমার। মন খারাপ হয়। মনে হয়, এই দেখা তো ফুরিয়েই এল। এর পরে আবার কবে কে জানে!
তুমি বোঝো?
*****
-- নিয়ে চলো,
নিয়ে চলো সেই দেশে ---
-- পুজো পেরোলেই সে দেশে
তড়িঘড়ি সন্ধে নেমে আসে।
আশ্বিন ছুটিতে চলে গেলে
তার পাতা খসে পড়ে টুপটাপ
-- অনিশ্চিত স্টেশনে শুধু থাকে
রৌদ্রের পিঠে অভিশাপ
-- মাথানিচু মানুষেরা
সন্ধে হবে বলে বসে থাকে।
সেইখানে যাবে, চলো ...
-- সবাই নিজের নিজের মতো তাকায়
প্রত্যেকেরই জোর পড়ে ভিনখানে
-- সবাই ভালোবাসার হিসেব জানে।
কেবল তুমিই মানুষ হয়ে জোড়ো,
তুমিই কেবল নিজের মধ্যে পোড়ো।
-- কেন ছেড়ে যাবে, বলো
এই ঘর, আমার অনাচার?
এত কষ্ট পাও তুমি?
-- তুমি তো তোমার ছাড়া আর কিছু
চাও নি কোনোদিন।
ভালোবাসা, তারও বেশি থাকা রোজ
তাপে-সন্তাপে ---
সবশেষে তুমি তো তোমার বড়
কিছুই চাওনি আর।
একা ভেবেছিলে তুমি,
একা হলে পূর্ণ সব। ক্ষয়ও সঞ্চয়।
শায়রের ডুবজলে হৃদয়ের দান ভেসে যায়।
বোঝে না হৃদয়।
তাই চলে যাওয়া।
*****
রাত হয়েছে। জানি তুমি ক্লান্ত এবং তোমার উত্তর আমার অপছন্দই হবে, তবু, যদি জানতে চাই, এক্ষুনি, এক্ষুনি একবার সমুদ্রে যাবে? জোয়ারের মুখে একবার দাঁড়াই দুজনে মিলে? থাক না আমাদের গুচ্ছের না-বোঝা একে অন্যকে। একবার আসবে? না হয় একটু দূরেই দাঁড়িও আমার থেকে! সেই ব্যবধানের মাঝে ঢেউ ভেঙে পড়ুক। টলিয়ে দিক আমাদের। পায়ের তলা থেকে বালি সরে যাক। শক্ত করে এবার আমরা আঁকড়ে ধরি একে অন্যের হাত, প্রয়োজনে। মনে মনে গেয়ে উঠি, “এই দীনতা ক্ষমা করো...”

Comments
Post a Comment