লক্ষ্মীদেবীর নব্য পাঁচালি
পুণ্য তিথি কোজাগরী, চন্দ্রমার সাজে
কমল-আসনে দেবী লক্ষ্মী বিরাজে।
গৃহস্থ করিছে পূজা, মহা আয়োজন,
মিষ্টান্ন-ফল-পুষ্প, ভক্ত সমাগম।
উঠান-দুয়ারে-ঘরে আলপনা আঁকা –
চরণযুগল; মাঝে ধানছড়া বাঁকা।
উলুধ্বনি মন্ত্র-যোগে সন্ধ্যাপূজা শেষ,
তখনও আছিল কিছু মধুর আবেশ।
সবে বলে, পাঁচালির কথা হোক শোনা
দেবীর ঐশ্বর্য সুর-আখরেতে বোনা।
গৃহস্থ বলিল, 'আমি নই পুণ্যজন,
দেবীর মাহাত্ম্য করি কেমনে বর্ণন?
যেই দেশে একদিন লক্ষ্মীপূজা হয়,
আরও বাকি কাল কত লক্ষ্মী অসহায়,
যে কাল না করে প্রেম-শ্রদ্ধা প্রাণপণ,
সে কালে দেবীরে করি কেমনে বর্ণন?
নিত্য যেথা লাঞ্ছিত দেবীর প্রতীতি,
ঘাত-অপমান যেথা তাঁর নিত্যস্মৃতি,
সেই দেশে কালে মোরা ঘোর তাপীজন,
এ মুখে কি শোভা পায় দেবীর বর্ণন?
করজোড়ে তাই বলি – দেবী, করো ক্ষমা,
আবির্ভূতা হও গৃহে, হে শক্তি পরমা!
নাহি জানি পূজাপাঠ, আচারোপাচার,
প্রকট হও গো দেবী, করো হে নিস্তার।'
এত বলি গৃহস্থ হইল নীরব,
বন্দিল সকলে বসি আন্তরিক স্তব।
ভক্তের হৃদয়ে দেখি অকূল সঙ্কট
অন্তরে লক্ষ্মীদেবী হলেন প্রকট।
মৃদুহাস্যে, দৃঢ়ভাষ্যে বলিলেন দেবী,
যে সত্য ব্যাকুল, আমি তাহাকেই সেবি।
ধন্য তোমার তাপ, ধন্য প্রার্থনা,
হৃদিপদ্মে অঞ্জলি দিয়েছো যন্ত্রণা।
শোনো তবে, এইরূপ আমার আখ্যান –
চারি গুণে করা হয় মোর গুণগান।
প্রথম ঐশ্বর্য মোর সৌভাগ্যরেখা;
পূজিলে আমারে হয় ভাগ্য-সাথে দেখা?
তাহা নয়, তাহা নয়, শুন এক মনে –
ভাগ্য তাহারই, যার সুখ পরিশ্রমে।
আমার কৃপা সে পায় শ্রমবিন্দুবৎ,
তাহা ভিন্ন ভাগ্য অতি বিষম বিপদ।
শ্রম-ভাগ্য দোঁহে মিলি ধন-যশ আনে,
এই দুই মোর দুই গুণ সবে জানে।
ধন আসে, যশ আসে, দম্ভ আসে পাশে,
সৌভাগ্য আপনারে আপনি বিনাশে।
ধনেতে আমার স্থান, অহংকারে নয়
ধন বন্টন হলে, সবে মোরে পায়।
আর্ত-পীড়িত জনে যদি করো দান,
আমারই আশীষ পাবে বিপুলা, মহান।
তবে যদি ভাবো, দানে তুমি শ্রেষ্ঠতম,
দর্প টেনে নিয়ে যাবে অকাল-শমন।
দান নয়, বলো 'সেবা', মনে করো সেবা
না যদি বুঝে গো মন, বুঝে আর কে বা?
নত হও বিপুলা এ পৃথিবীর কাছে,
অনন্ত রাজধন গর্ভে তাঁর আছে।
তাঁর সৃষ্টি যত দেখো, প্রেম রেখো তাতে,
শ্রদ্ধায় সঁপিও হৃদি রজনী-প্রভাতে।
যদি পারো, তোমা-সনে রবে প্রতিপদ
আমার তৃতীয় ধন, অধ্যাত্ম-সম্পদ।
তিন গুণ যদি বুঝো মন-প্রাণ দিয়া,
চারি গুণে শ্রীরূপেরে দিবে গো রাখিয়া।
এই রূপ বাহ্য নয়, অন্তঃদরশন,
লক্ষ্মীর কৃপা হলে হয় বরিষণ।
শ্যামা না শুভ্রা তুমি, যায় আসে কার?
শ্রম-সেবা-শ্রদ্ধা এলে তুমিই আমার।
কলঙ্কিনী, অস্পৃশ্য, সন্তানহীনা
সবার উপরই বর্ষে লক্ষ্মীর করুণা।
আরও শুন ভক্তজন, শেষ কথা কই
বৎসরে এক নয়, রোজদিনই রই।
নহি শুধু কুলবধূ, নহি শুধু মাতা,
নরনারী উভয়েই আমি অধিষ্ঠিতা।
ঘরে কেউ করে মোর পূজা-অনুষ্ঠান,
বাহিরে যে যায়, সে-ও সমান সমান।
কর্তব্য যার যেথা, সে সেথায় যদি
ঢালে গো হৃদয়ধারা, বহে প্রেমনদী,
আনন্দ-সম্পদ যদি ধরায় ছড়ায়,
নানা মতে, নানা পথে সে-ই মোরে পায়।
শ্রীরামকৃষ্ণার্পণমস্তু
এবার লক্ষ্মীপুজোয় এইটাই পড়ব 😊
ReplyDeleteথাঙ্কু ❤️
Deleteথ্যাঙ্কিউ, এটার দরকার ছিল 😁❤️
ReplyDelete❤️ থাঙ্কু
Deleteঅত্যন্ত প্রশংসনীয়, ভাবনা, কাব্যিক বিন্যাস, সব দিক দিয়ে। নারীও যে শ্রমজীবী, ঘরে ও বাইরে, সেইটা বড় করে মনে করিয়ে দেয়। পাঁচালী তো লৌকিক ধর্মের অঙ্গ, তাই পাঁচালী তো যুগে যুগে নতুন করে লিখতেই হয়!
ReplyDelete