মণিপুর, ২০২৩
আমি দেখতে পারি নি।
দেখবো না, বলেছি নিজেকে।
আমার জানতে ইচ্ছে করছে না
কী কারণে কী হয়েছে,
আমি জানতে চাই না
আইনের কোন ধারায় কী হতে পারে,
মায়েদের আব্রু ছিঁড়ে
নগ্ন হাঁটানো হয়েছে এ দেশের রাস্তায়
এর কোনও কারণ থাকতে পারে না।
এর উত্তর আইন হতে পারে না।
২
চোখ-কানের স্নায়ু বেয়ে খবর তবু
এসে পৌঁছয় ঠিক।
কলকাতা শহর শান্ত।
সুশীল গৃহকোণ শান্ত।
খবরটা পুরো না শুনেই আমরা মেনে নিয়েছি –
'মণিপুর! এ তো লেগেই আছে!'
ভাবি, লিখবো না এ নিয়ে একটা কথাও!
কী করেছি, এই খবর জেনে
কী করেছি, শিরদাঁড়াহীন কাঁদুনি গেয়ে
মুখ ফিরিয়ে থেকে কী করলাম আমি
তাকালেই বা কী করতে পারতাম?
দূরের, সুখী শহরের
স্বচ্ছল, শীতলশোণিত মধ্যবিত্ত হয়ে
আমি চুপ করে দেখা ছাড়া
আর কোনও অবদান রেখেছি কোনোদিন?
৩
তাই, নীরবতা শ্রেয়।
(জনান্তিকে, প্রেয়ও)
হে দেশ, দ্বিধা, সমকাল
আমি নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ –
কেবল আলোর কথা লিখবো আমি,
প্রবল বোমাবর্ষণের শেষে
আমি লিখবো ফুলের ফুটে ওঠা,
দোয়েলের ডাক
প্রাচীন, পরমাভিমুখী কিছু মানুষকে ভালোবাসি –
সে কি আমার ভুল, মা?
তাঁদের হৃদয়ের তপ্ত লাভা
আমার চিরন্তন মনে হয়,
আমার আনন্দ হয়, বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে
তাঁদের কথা ভেবে –
সে কি আমার ভুল, মা?
আমার আনন্দিত হওয়া উচিত ছিল না,
ভালোবাসা উচিত ছিল না?
৪
দুঃখের সময়ে আনন্দ কি অপাংক্তেয়, মা?
আমি তো লুটে পুটে
ভোগ করতে চাই নি একা তাকে,
সবার কাছে তাকে পৌঁছে দেবো ভেবেছি
সে কি আমার ভুল হয়ে গেছে, মা?
মায়েদের নগ্ন করে
উল্লসিত হয় মানুষ,
ধর্ম ধর্মকে কুপিয়ে পূজিত হয় –
সে দেশে দাঁড়িয়ে আমার আনন্দে, ঈশ্বরে বিশ্বাস
ভুল হয়ে গেছে, মা।
আমার শোকের, রাগের, হিংসার কথা
বলা উচিত ছিল।
উস্কে দিতে হতো প্রতিহিংসা।
বলতে হতো, সুরাহা নেই। নিস্কৃতি নেই।
৫
মণিপুরকে আমি ভুলিনি।
এ দেশের প্রতিটি অশিক্ষার দাগ,
বর্বরতার অভিধানের প্রতিটি গৌরবময় শব্দ
আমার মনে আছে।
আমি আনন্দে উদাসীন হতে চাই নি মা,
আনন্দে উপশম চেয়েছিলাম।
কে তোমার কাছে জানতে চাইবে
জানি না,
তুমি বোলো, ওদের বুঝিও –
আমার দুর্বলতা, মেরুদণ্ডহীনতা কবুল
কিন্তু আমি শুশ্রূষাভিন্ন কথা বলতে পারি না।
আমি পারি না বন্দুক তোলার গান লিখতে,
উগ্রতার বিরুদ্ধে উগ্রতা
রক্তের উত্তরে রক্ত,
মৃত্যুর উত্তরে মৃত্যু
আমি লিখতে পারি না
কিন্তু কেউ এ কথা বুঝবে না।
৬
যুদ্ধজর্জরিত পথে
জল নিয়ে বসে থাকা কি নীরবতা?
৭
এই উটকো, আধপেটা দেশে
শান্তির কাছে, প্রেমের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকে,
প্রতিদিন অপ্রেম, অশান্তির পাঠ নিতে নিতে
এই মানবজন্ম নিয়ে আমি কী করবো, মা?
মানুষ হয়ে, আমি
কোনদিকে যাবো?
হৃদয়টি ভাগ করে ছুঁড়ে দেব
কোন, কোনদিকে?
৮
কাল সকালে আবার চাকরি। উপার্জন।
যাওয়া আসার পথে
মিষ্টি লজেন্স, একুশে জুলাই, ফজলি আম।
মণিপুর থাকবে না ত্রিসীমানায়
সেই মায়েরা জানবেন,
এ দেশে সন্তানেরা
তাঁদের লজ্জাটুকু তারিয়ে তারিয়ে দেখে শুধু
মণিপুর জ্বলছে।
সারা দেশ
সার্কাসের তাঁবুতে কোঁকিয়ে ওঠা প্রাণী যেন।
তার জন্য আগের রাতে
শান্তির ঘুম তুচ্ছ করে
একটা অব্দি জেগে লেখা
এই আত্মত্যাগ আমি কোথায় রাখি!
৯
তোমাকে বুঝি নি, মণিপুর
আমি তোমার থেকে অনেক দূরে
আমি হয়তো আমার দেশকে কিছুই বুঝি না
হয়তো আমার মাকে রাস্তা দিয়ে এভাবে
হাঁটিয়ে নিয়ে গেলে বুঝতাম
হয়তো আমার বাবা কাস্তের কোপ খেলে
বুঝতাম
আমি তোমাদের কিছুই বুঝি নি।
মণিপুর, তোমার উত্তরে আমি কবিতা লিখছি –
এইই তো অবিশ্বাস্য, ঘৃণ্য।
১০
আমায় ক্ষমা কোরো, মা।
একমাত্র শান্তির, প্রেমের কথা বলতেই আমি পারি।
আমায় ক্ষমা কোরো।
Comments
Post a Comment