Followers

পয়লা অগ্রহায়ণ

হিরণ্ময়ী, শান্ত বাগানে মাধবীলতার সংসার।
রঙ্গন ফুলের সারি, 
সবচাইতে অসুখী প্রান্তে আলো হয়ে রাধাচূড়া, স্বর্ণচাঁপা 
সবই আছে।
আছে কংক্রীটের ঝুনো রাস্তা, ইঁটের তে-কোণ ফেন্সিং,
বিরহী, রবিবাসরীয়, সরকারি স্কুলবাড়ি 
একটু দূরেই খাঁ-খাঁ করে অরণ্যের দুপুরের মতো।
   
বাগানের এই মুখ থেকে যে-কোনো দিকেই যাওয়া যায়,
যেতে পারো তুমি।
অন্য দিনের মতো অসময়ের কাজে চলে যেতে পারো
ইস্কুলের দোতলায়, জমানো খাতার স্তূপে;
নাকি এক্ষুনি জং-ধরা নিচু গেট ঠেলে
বেরিয়ে চলে যাবে 
           যে ঠিকানায় আমার যাওয়া হয়নি কোনোদিন?
যে-কোনো দিকেই যাওয়া যায় এই মুখ থেকে।
ইতিহাস, ক্ষয়, ক্ষতি, কথালাপ, অনুচ্চার
সব ফেলে চলে যাওয়া যায়।
তাই তুমি বলো,
"অগোছালো জমিয়ে রাখার স্বভাব তোমার আজও, তাই না?"
   
হিরণ্ময়ী, শান্ত বাগানে কবে যেন দেখা হয়েছিল
আমাদের। আমার, তোমার।
   
তা ঠিকই। আমি প্রখর বুদ্ধিমত্তায় তোমার চোখ এড়িয়ে যেতে যেতে
বলি, তা ভুল নয় কিছু।
জমিয়ে রাখার অভ্যাস আমার অনেকদিনের,
আর গোছানো ব্যাপারটা তো যে যেভাবে দেখবে, তার ওপর।
নয়?
    
শীতের মুখে, এই বাতাসিয়া দিনগুলোর 
কোনো স্মৃতিই থাকে না, বলো? 
মনে হয়, বছরের জাবদা-খাতায় কিছু তারিখ এমন রাখা থাকে
যাদের কাজই হারিয়ে যাওয়া, নষ্ট হয়ে যাওয়া
তারা স্মৃতির যোগ্য নয়, তাই স্মরণাতীত।
তাই এমন দিনেই তোমার সঙ্গে আমি,
       এমন দিনই বিস্মৃতির জন্য মনে থেকে যায়,
হেমন্তের সোনাঝুরি তোমার আঁচলে নেমে আসে
    
দেখা হয় হিরণ্ময়ী, শান্ত বাগানে
আমাদের। তোমার, আমার।
    
টুংটাং শব্দ হয় চা-কাপের, 
দৈবাৎ ছাতিমের ধ্যান ভেঙে স্টোভের কেরোসিন-গন্ধ 
নাকে আসে।
দারোয়ান স্টীলের প্লেটে বসিয়ে দু'জনের চা নিয়ে হাজির।
তোমার শহরে না-জানিয়ে এলাম বলে কি এই আপ্যায়ন?
চুমুক দিই। ঘন, খয়েরি রং। চিনি সামান্যই। ভালো।
কী প্রয়োজন ছিল এসবের! 
উত্তরে তুমি হাসো।
অনেকদিন পর হাসলে। 
ভেতরে কে যেন বলে ওঠে,
      প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল সবেরই
    
এই যে দিনান্তের শুরুতে তুমি শীত কাটানোর 
এমন মিথ্যে আয়োজন করলে,
এই যে ইউক্যালিপ্টাস থেকে বিশৃঙ্খল পাতার
মাটিতে এমন সমর্পণ,
যেমন আমার হঠাৎই মনে এলো, আজ পয়লা অঘ্রাণ
আর আজকের দিনে পৃথিবী আমাদের মনে রেখে দেবে 
মিথ্যে সাক্ষাতের আখ্যানে,
এতগুলো মিথ্যের প্রয়োজন ছিল
তোমার ওই হাসির সত্যের জন্য।
    
গোধূলি নেমে আসে, আর
এ-পথ থেকে সে-পথে হেঁটে যাও তুমি, একা একা
বাগানের আলস্যে
তোমার ঘিয়ে রঙা শাড়ি শেষবার স্পর্শ করি আমি
আঁচলের জমি দেখার নামে।
মনে পড়ে,
এককালে তোমার কষ্ট হতো সমুদ্রের ওপারে এক দেশ আছে শুনে;
মনে পড়ে,
এই গ্রামের দুর্বৃত্ত এক বহুরূপী, কপালে সিঁদুর মেখে
মৃত্যুর আগের দিন তোমায় "মা" বলে ডেকেছিল;
মনে পড়ে, স্তব্ধতা বোঝানো ছাড়া শব্দের আর কোনো দায় নেই
   
হিরণ্ময়ী, শান্ত বাগানে
নক্ষত্রের চাঁদোয়া জুড়ে, জুড়ে
তুমি এগিয়ে চলো,
আমি দূর থেকে দু'দন্ড দেখি তোমায়
বড় বেশি কাছে এসে গেছি
       দূর থেকে দেখি আজ,
সাধারণ বিস্মৃতির দিনে
তুমি পৌষধানের ক্ষেতের দিকে যাও
        নত হও, 
              মানুষের সহজ হও,
বলো, ভালোবাসি
   
আমি দেখি,
এমন পথের মুখ
বারবার ফিরে আসে,
বারবার চলে যাওয়া যায়।


(১লা অঘ্রাণ, ১৪২৬)

Comments